দিনটা হল ১৪ মে ২০১৩ সাল।সকাল ১০টা। চারিদিকে হরতালের ঘনঘটা।কয়েকদিন আগে ট্রায়বুন্যালের রায়ে কামরুজ্জামান(ঝামাত নেতা) এর ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে।আর এর প্রতিবাদেই নব্য রাজাকারদের হরতাল(জামাত শিবির এখনই পালা।সামনে আরো দাবানি আছে!)। আর একদিকে বাংলার উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে মহাসেন।ঠিক এসময়েই আমার যাত্রা সিলেট থেকে চট্টগ্রাম।সিলেট স্টেশনে বসেই এই লেখাটা লিখছি।তাই বলতে পারছি না একটু পরে কি হতে চলছে।এটাও জানি না ঠিক কখন পৌছাব বা আদৌ পৌছাব কিনা।এক অজানা উত্তেজনা সারাক্ষণ দাবিয়ে রাখছে মনটাকে।
সময় ১২.৪৫।
এগিয়ে চলছে ট্রেন।এর মধ্যে কয়েকটি স্টেশন ছেড়ে এলো।আর সে ফাঁকে ট্রেনে উঠে এসছে বেশ কিছু হকার ভিক্ষুক আর যাত্রী।হকারগুলো ক্লান্তিহীন তাদের পণ্য নিয়ে বকে যাচ্ছে।লোকজনও তাদের অবসর কাটাচ্ছে দরদাম করে।এর মাঝে জনৈক আনারসবিক্রেতার সাথে বেঝে গেল একজনের।চারপাশের মানুষের মধ্যস্ততায় শেষমেষ পরিবেশ শান্ত হল।সবচেয়ে লক্ষণীয় হল ভিক্ষুকগুলোর ভিক্ষার ধরণ।বেশিরভাগ ভিক্ষুক প্রতিবন্ধী ,কেউ আল্লাহর নামে,কেউ হাতে চকোলেট ধরিয়ে দিয়ে,কিউ আবার মসজিদের নামে ভিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে।কিছুটা আগ্রহ আর কিছুটা বিরক্তির মধ্য দিয়ে সময় কেটে যাচ্ছে।
সময় ১.৩০।
ধীরে ধীরে পাহাড়ের ঘনত্ব বাড়ছে।বন জঙ্গলও বেড়ে চলছে।একসময় নিজেকে আবিষ্কার করলাম গভীর বনের মাঝখানে।ঘন বাঁশঝার, পাহাড়ি লতা আর নাম না জানা গাছের ভয়াল জঙ্গল ভেদ করে চলছে ট্রেন।কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম এটাই সেই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যাণ।বিটিভিতে এই বনের উপর অনেক ডকুমেন্টরি দেখেছি।আমি যখন গা শিরশির উত্তেজনায় ভুগছি তখন আমার পাশের জন মাথা হেলে দিয়ে ঘুমাচ্ছেন।একটু মায়া হল বেচারার জন্য।যদিও ক্ষণিক আগেই তিনি বলেছেন এই পথে অনেক যাওয়া আসা আছে তাঁর।যাক্ একটু পর ট্রেন শ্রীমঙ্গল স্টেশন ধরল।বুঝতে পারলাম মানুষ কেন এই জায়গার এত প্রশংসা করে।এর কিছু পরের দ্শ্য আরো চমৎকার।যেদিকে চোখ যায় শুধু চা বাগান ।বাগানের মধ্য দিয়ে চলে গেছে পাহাড়ি ছড়া।এমন অনেক কিছু দেখতে দেখতে কখন যে ক্ষুধা এসে ভর করল বুঝতে পারলাম না।ট্রেনে উঠার আগে কেনা বিরিয়ানী দিয়ে পেট পূজা সারলাম।তবে সত্যি বলতে বিরিয়ানীর পুরো ৭০ টাকাই জলে গেল।এমন বিদঘুটে বিরিয়ানী আগে কখনও খাইনি!:/;>
সময় ৩টা।
সাধের বিরিয়ানী পেট না ভরাতে পারলেও চিপস্,পপকর্ন কিন্তু ব্যর্থ না।পাশের মানুষ কী ভাবছে কি জানি।একবার তো তাদের অভুক্ত রেখে বিরিয়ানী খেলাম।তারপরও শুধু খাই খাই করা নিশ্চই তাদের ক্ষুধা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।কিন্তু কি করব বলুন খাওয়াতেই যে আমি সবচে বেশী মজা পাই।পাক্কা ভোজনরসিক বলতে পারেন।এই খাওয়াখাইয়ি থেকে দূরে থাকার জন্য কি করা যায় ভাবছি।ঘুমানো যায়।ল্যাপটপ ব্যাগে ঢুকিয়ে এক ঘুম দেওয়ার চিন্তা করছি।
সময় ৬টা।
এক ঘুমে সন্ধ্যা হয়ে গেল।ঘুম থেকে উঠে মনে মনে একবার বললাম,আমি কুতায়?হুম,ব্রাক্ষণবাড়িয়া স্টেশন মাত্র ক্রস করলাম।আরও অনেক পথ বাকি।কখন পৌছাবো খোদাই জানে।আর দেখলাম ট্রেন হঠাৎ হঠাৎ খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়,এরপর বিপরীতমুখী অন্য একটি ট্রেন এটিকে ক্রস করে।বুঝলাম আখাউরার পর ঢাকা চিটাগাং রুটে চলে আসায় ট্রেনের ট্রাফিক অনেকে বেড়ে গেছে।
সময়ের সাথে সাথে সূর্য গড়িয়ে আসতে শুরু করেছে।লালাভ আভায় ভরে আসছে চারিদিক।ধীরে ধীরে রক্তিম সূর্য ডুবে গেল কুমিল্লার আকাশে।এমন দিগন্ত দেখা হয় না অনেকদিন।মনটা খুব ভালো হয়ে গেল।দিগন্তের সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা করছে খুব।এসময়টা যদি আরও দীর্ঘায়ীত করা যেতো।
সন্ধ্যার পর এক কাপ চা খেলাম।ট্রেন এখন ফেনী স্টেশনে।কিছুক্ষণ আগেও কামরাটি মানুষে ভরে ছিলো,এখন প্রায় ফাঁকা।পাশের একজন গিটারে গান ধরল।বেশ ভালই বাজান তিনি তবে গলা তেমন খাসা নয়।'চলে গেছ তাতে কি . . . . .'।
প্রায় নয়টার দিকে ট্রেন ঢুকল চট্টগ্রাম স্টেশনে।লোকজনের হুরোহুরিতে টিকাই দায়।সবার আগে নামার তাড়া।সবাই নামার কিছুক্ষণ পর আমি নামলাম।নেমেই বুঝলাম আমার চট্টগ্রাম আমারই আছে।অদ্ভুত এক ভাল লাগা মনকে আচ্ছন্ন করল।
যা দেখছি তাই ভাল লাগছে।পাশের পঁচা ডাস্টবিনের গন্ধও নাক বন্ধ করছে না।যেদিকে তাকাই যা দেখি তাই মনে হয় পরিচিত,বহুপথের দূরত্ব ঘুচিয়ে আমরা আবার আজ একসাথে।এত আনন্দ আমি কোথায় রাখি?!!
আমার চাটগাঁ সুন্দরীর রূপ নতুন করে দেখব বলে আর তর সইছে না।স্টেশন এলাকায় কিছু সময় কাটিয়ে এলাম নিউমার্কেট।এরপর রিকশা ধরে বাসা।
জানি,আবার ফিরে যেতে হবে চট্টলাকে ছেড়ে ।কিন্তু বুকের মাঝে সবসময় থাকবে পাহাড় নদী একাকার করা এই নগরী।এখানে কাটানো প্রতিটি দিনের বিনিময়ে আমি একেকটি বছর গুনতে রাজি।তবু জানি থাকতে হবে এই শহরকে ছেড়ে।চোখের পানিতে কর্ণফুলী হবে কিন্তু কোন চেরাগ আলী আর চেরাগ জ্বালবে না।
উত্তেজনা আরও বাড়াতেই বোধহয় দেরি করছে ট্রেনটা।গতকাল ছাথ্রলীগের গন্ডগোলে ভার্সিটি(SUST) অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।তার সাথে সামার ভ্যাকেশ্যন যোগ হওয়াতে বাংলালিংক দামেই ছুটি পেয়েছি বলা যায়।তবে ছাত্রলীগের চরিত্র আরেকবার উন্মোচিত হল।সাধে কি আর মানুষ এদের কুত্তালীগ বলে।কুকুরকেই শুধু দেখা যায় নিজেদের মধ্যে সারাক্ষণ ঝগড়া লেগে থাকতে।এমন অনেক কিছু চিন্তা করতে করতে এক সময় ট্রেন ছড়ল।তবে সোয়া দশটার জায়গায় ১১টা ৫০ এ। দুর্ভাগ্য!জানালার পাশের সিট পেলাম না।তবে সিট বেশ আরামদায়ক।বসতেই তলিয়ে গেলাম ফোমের গদিতে।পাশের জনের ঘাড়ের উপর দিয়ে চোখে আসতে লাগল রাস্তা,নদী,প্লাবিত জনপদ,পাহাড়।পাশের রাস্তা দিয়ে ছুটে চলা লেগুনা সিএনজি ইয়া বড় ট্রেনটিকে অতিক্রম করার মজা নিচ্ছে।ভিতরে থাকা বাচ্চাগুলো অবাক দ্ষ্টিতে দেখছে ট্রেনকে।হয়ত কোন অজানা গন্তব্যের দিকে ছুটে চলা ট্রেনই তাদের কাছে কালস্রোত।লাইনের পাশের বাড়ি ঘর থেকে দৌড়ে নেমে আসছে উদল পিচ্চি বাচ্চার দল আর কোমরে হাত দিয়ে বিশেষ ভঙ্গিতে দাড়িয়ে দেখছে আমাদের বাহনকে।আবার কৈশরে ডুব দিতে ইচ্ছে করছে এদের দেখে।
সময় ১২.৪৫।
এগিয়ে চলছে ট্রেন।এর মধ্যে কয়েকটি স্টেশন ছেড়ে এলো।আর সে ফাঁকে ট্রেনে উঠে এসছে বেশ কিছু হকার ভিক্ষুক আর যাত্রী।হকারগুলো ক্লান্তিহীন তাদের পণ্য নিয়ে বকে যাচ্ছে।লোকজনও তাদের অবসর কাটাচ্ছে দরদাম করে।এর মাঝে জনৈক আনারসবিক্রেতার সাথে বেঝে গেল একজনের।চারপাশের মানুষের মধ্যস্ততায় শেষমেষ পরিবেশ শান্ত হল।সবচেয়ে লক্ষণীয় হল ভিক্ষুকগুলোর ভিক্ষার ধরণ।বেশিরভাগ ভিক্ষুক প্রতিবন্ধী ,কেউ আল্লাহর নামে,কেউ হাতে চকোলেট ধরিয়ে দিয়ে,কিউ আবার মসজিদের নামে ভিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে।কিছুটা আগ্রহ আর কিছুটা বিরক্তির মধ্য দিয়ে সময় কেটে যাচ্ছে।
সময় ১.৩০।
ধীরে ধীরে পাহাড়ের ঘনত্ব বাড়ছে।বন জঙ্গলও বেড়ে চলছে।একসময় নিজেকে আবিষ্কার করলাম গভীর বনের মাঝখানে।ঘন বাঁশঝার, পাহাড়ি লতা আর নাম না জানা গাছের ভয়াল জঙ্গল ভেদ করে চলছে ট্রেন।কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম এটাই সেই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যাণ।বিটিভিতে এই বনের উপর অনেক ডকুমেন্টরি দেখেছি।আমি যখন গা শিরশির উত্তেজনায় ভুগছি তখন আমার পাশের জন মাথা হেলে দিয়ে ঘুমাচ্ছেন।একটু মায়া হল বেচারার জন্য।যদিও ক্ষণিক আগেই তিনি বলেছেন এই পথে অনেক যাওয়া আসা আছে তাঁর।যাক্ একটু পর ট্রেন শ্রীমঙ্গল স্টেশন ধরল।বুঝতে পারলাম মানুষ কেন এই জায়গার এত প্রশংসা করে।এর কিছু পরের দ্শ্য আরো চমৎকার।যেদিকে চোখ যায় শুধু চা বাগান ।বাগানের মধ্য দিয়ে চলে গেছে পাহাড়ি ছড়া।এমন অনেক কিছু দেখতে দেখতে কখন যে ক্ষুধা এসে ভর করল বুঝতে পারলাম না।ট্রেনে উঠার আগে কেনা বিরিয়ানী দিয়ে পেট পূজা সারলাম।তবে সত্যি বলতে বিরিয়ানীর পুরো ৭০ টাকাই জলে গেল।এমন বিদঘুটে বিরিয়ানী আগে কখনও খাইনি!:/;>
সময় ৩টা।
সাধের বিরিয়ানী পেট না ভরাতে পারলেও চিপস্,পপকর্ন কিন্তু ব্যর্থ না।পাশের মানুষ কী ভাবছে কি জানি।একবার তো তাদের অভুক্ত রেখে বিরিয়ানী খেলাম।তারপরও শুধু খাই খাই করা নিশ্চই তাদের ক্ষুধা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।কিন্তু কি করব বলুন খাওয়াতেই যে আমি সবচে বেশী মজা পাই।পাক্কা ভোজনরসিক বলতে পারেন।এই খাওয়াখাইয়ি থেকে দূরে থাকার জন্য কি করা যায় ভাবছি।ঘুমানো যায়।ল্যাপটপ ব্যাগে ঢুকিয়ে এক ঘুম দেওয়ার চিন্তা করছি।
সময় ৬টা।
এক ঘুমে সন্ধ্যা হয়ে গেল।ঘুম থেকে উঠে মনে মনে একবার বললাম,আমি কুতায়?হুম,ব্রাক্ষণবাড়িয়া স্টেশন মাত্র ক্রস করলাম।আরও অনেক পথ বাকি।কখন পৌছাবো খোদাই জানে।আর দেখলাম ট্রেন হঠাৎ হঠাৎ খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়,এরপর বিপরীতমুখী অন্য একটি ট্রেন এটিকে ক্রস করে।বুঝলাম আখাউরার পর ঢাকা চিটাগাং রুটে চলে আসায় ট্রেনের ট্রাফিক অনেকে বেড়ে গেছে।
সময়ের সাথে সাথে সূর্য গড়িয়ে আসতে শুরু করেছে।লালাভ আভায় ভরে আসছে চারিদিক।ধীরে ধীরে রক্তিম সূর্য ডুবে গেল কুমিল্লার আকাশে।এমন দিগন্ত দেখা হয় না অনেকদিন।মনটা খুব ভালো হয়ে গেল।দিগন্তের সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা করছে খুব।এসময়টা যদি আরও দীর্ঘায়ীত করা যেতো।
সন্ধ্যার পর এক কাপ চা খেলাম।ট্রেন এখন ফেনী স্টেশনে।কিছুক্ষণ আগেও কামরাটি মানুষে ভরে ছিলো,এখন প্রায় ফাঁকা।পাশের একজন গিটারে গান ধরল।বেশ ভালই বাজান তিনি তবে গলা তেমন খাসা নয়।'চলে গেছ তাতে কি . . . . .'।
প্রায় নয়টার দিকে ট্রেন ঢুকল চট্টগ্রাম স্টেশনে।লোকজনের হুরোহুরিতে টিকাই দায়।সবার আগে নামার তাড়া।সবাই নামার কিছুক্ষণ পর আমি নামলাম।নেমেই বুঝলাম আমার চট্টগ্রাম আমারই আছে।অদ্ভুত এক ভাল লাগা মনকে আচ্ছন্ন করল।
যা দেখছি তাই ভাল লাগছে।পাশের পঁচা ডাস্টবিনের গন্ধও নাক বন্ধ করছে না।যেদিকে তাকাই যা দেখি তাই মনে হয় পরিচিত,বহুপথের দূরত্ব ঘুচিয়ে আমরা আবার আজ একসাথে।এত আনন্দ আমি কোথায় রাখি?!!
আমার চাটগাঁ সুন্দরীর রূপ নতুন করে দেখব বলে আর তর সইছে না।স্টেশন এলাকায় কিছু সময় কাটিয়ে এলাম নিউমার্কেট।এরপর রিকশা ধরে বাসা।
জানি,আবার ফিরে যেতে হবে চট্টলাকে ছেড়ে ।কিন্তু বুকের মাঝে সবসময় থাকবে পাহাড় নদী একাকার করা এই নগরী।এখানে কাটানো প্রতিটি দিনের বিনিময়ে আমি একেকটি বছর গুনতে রাজি।তবু জানি থাকতে হবে এই শহরকে ছেড়ে।চোখের পানিতে কর্ণফুলী হবে কিন্তু কোন চেরাগ আলী আর চেরাগ জ্বালবে না।
No comments:
Post a Comment